জোট হলেও ভোট নিজ দলের প্রতীকেই
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর মধ্যে জোট হলেও প্রার্থীদের নিজ দলের প্রতীকেই ভোটে প্রতিযোগিতা করতে হবে। আবার কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকলেও সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। ভোটাররা সে আসনে ‘না’ ভোট দিতে পারবেন। ২০১৪ সালের পাতানো নির্বাচনের মতো যেন না হয়, সেজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনে কোনো পলাতক আসামি প্রার্থী হতে পারবেন না। এমন সব বিধান রেখে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে পরিষদের সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান।
এদিকে বিএনপির এক শীর্ষ নেতা আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে সম্প্রতি এক বৈঠকে প্রস্তাব করেছিলেন, জোটবদ্ধ হলেও প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের প্রতীকে বা নিজ দলের প্রতীকের বাইরে জোটের শীর্ষ বা মূল দলের প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আইন উপদেষ্টা এ প্রস্তাবে তখন মৌখিকভাবে সম্মতিও জানান; কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদে গতকাল সংশোধিত আরপিও অনুমোদনের পর বিএনপির ওই শীর্ষ নেতা আইন উপদেষ্টার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে বিষয়টি সংশোধন করে ফের প্রস্তাব দিলে তা বিবেচনা করা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে উপদেষ্টা পরিষদে সংশোধিত আরপিও অনুমোদন পেলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হলো।
গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমির ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আরপিওর অনুমোদিত খসড়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকেও যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তিন বাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের প্রয়োজন হবে না।’
সংশোধিত আরপিওর নানা দিক তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘যদি নির্বাচনী জোট হয়, তাহলে জোটের অংশ হলেও দলের যে প্রতীক, তা দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে সংজ্ঞা, সেখানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার সম্পর্কিত যেসব বিধান ছিল, সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচন করতে পারবেন না, এটিও যুক্ত করা হয়েছে।’
আরপিওর সংশোধিত খসড়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘যারা নির্বাচন করবেন, তাদের এফিডেভিটের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে যত আয় ও সম্পত্তি আছে, তার সবকিছুর বিবরণ দিতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা এই নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। জেলা নির্বাচনী কার্যালয় জেলার নির্বাচনী কর্মকর্তা ঠিক করবেন।’
সংশোধিত আরপিওতে ‘না’ ভোটের বিধান রাখার কথা জানিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘যে সংসদীয় আসনে একজন প্রার্থী থাকবেন, সেখানে ভোটাররা না ভোট দিতে পারবেন। আর কোনো সংসদীয় আসনে অনিয়ম হলে পুরো আসনের ভোট বন্ধ করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।
সংশোধিত আরপিওতে পলাতক আসামি ভোটে অংশ নিতে পারবেন না।’
পলাতক বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘পলাতক হচ্ছে আদালত যখন পলাতক ঘোষণা করেন। যেদিন আদালত আপনাকে আসতে বলছেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, আসছেন না—আদালত পলাতক ঘোষণা করেন। বিচার চলাকালীন পলাতক হয়।’
সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের নতুন বিধানের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রার্থীদের হলফনামায় এফিডেভিটের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি আয়ের উৎসের বিবরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এসব কিছু প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন—প্রার্থীদের দেশি-বিদেশি আয়ের উৎস, সম্পত্তি, বিবরণ নির্বাচন কমিশনে দিতে হবে। এটা ওয়েবসাইটে পাবলিশ করে দিন, সবাই জানবে কার কী সম্পত্তি। উনি নির্দেশ দিয়েছেন, এ-সংক্রান্ত বিধান আইনে থাকবে।’
সংশোধিত আরপিওতে না ভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান আসিফ নজরুল। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘একজন প্রার্থী থাকলে সেখানে না ভোট হবে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। ২০১৪ সালের ভুয়া, সাজানো নির্বাচন যেন না হয়, সেজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন যে প্রার্থী—পছন্দ না, সেখানে না ভোট দিতে পারবেন ভোটাররা। আইনে বহুল সমালোচিত ও বিতর্কিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম বাতিল করা হয়েছে।’
জোটভুক্ত হলেও প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে সংশোধিত আরপিওতে। আগে ভোটের সময় জোটভুক্ত হয়ে জনপ্রিয় বা বড় দলের প্রতীকে ভোট করার সুযোগ ছিল। এবার সে সুযোগ থাকছে না বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা।